মো. সেলিম হোসেন, 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কালজয়ী গান ‘দুঃখ যদি না পাবে তো’ নতুন সংগীতায়োজন ও সমকালীন উপস্থাপনায় প্রকাশ পেয়েছে। দুই বাংলার জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী পৌলমী গাঙ্গুলীর কণ্ঠে পরিবেশিত গানটির সংগীতায়োজন করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেস গিটারিস্ট শেলডন ডি’সিলভা। ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশের পর গানটি ইতোমধ্যে শ্রোতাদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।


রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টিকে আধুনিক সংগীতের পরিসরে নতুনভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস স্পষ্ট এই পরিবেশনায়। গানের মূল সুর ও কথার গভীরতা অক্ষুণ্ন রেখে জ্যাজ, ফিউশন ও সমকালীন সাউন্ড ডিজাইনের মিশেলে তৈরি করা হয়েছে নতুন সাউন্ডস্কেপ। ফলে ক্লাসিক ও আধুনিকতার এক সেতুবন্ধন গড়ে উঠেছে, যা নতুন প্রজন্মের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। ভিডিও নির্মাণেও রাখা হয়েছে সংযত নান্দনিকতা। আবেগঘন মিনিমালিস্টিক উপস্থাপনা, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং ধীরগতির দৃশ্যায়ন গানের অনুভূতিকে আরও গভীর করেছে।


শিল্পী পৌলমী গাঙ্গুলী একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সংগীতশিল্পী ও সংগীতশিক্ষক। তিনি ‘সিম্ফনি মিউজিক’ এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও পরিচিত। বর্তমানে ভারতের মহারাষ্ট্র'র মুম্বাই ও কলকাতায় অবস্থান করে সংগীতচর্চা ও শিক্ষাদানে যুক্ত আছেন। সংগীত শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। পারিবারিকভাবে তাঁর শেকড় বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হেমনগর জমিদার হেমচন্দ্র পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, যা তাঁর শিল্পচর্চায় ঐতিহ্যের একটি স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছে।


অন্যদিকে সংগীতায়োজক শেলডন ডি’সিলভা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে বেস গিটারকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিচিত। তিনি কাজ করেছেন বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে, যেমন জন ম্যাকলাফলিন, গাথ্রি গোভান, আল জারো, জাকির হোসেন, ত্রিলোক গুর্তু, লুইজ ব্যাংকস ও হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া। পাশাপাশি তিনি শংকর এহসান লয়, সেলিম, সুলেমান, বিশাল, শেখর, লেসলি লুইস এবং প্রীতম চক্রবর্তীর মতো জনপ্রিয় সংগীত পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন।


আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস এ ‘আমেরিকান মিউজিক রুটস’ কর্মসূচিতে এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ সংগীত উৎসবে অংশ নিয়ে নিজস্ব দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বলিউডের জনপ্রিয় গান ‘রাম চাহে লীলা’তে তাঁর বেসলাইন বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এমনকি রক অন ২ চলচ্চিত্রে ক্যামিও ভূমিকায়ও দেখা গেছে তাঁকে।
সংগীতজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো পাকিস্তানের জনপ্রিয় টেলিভিশন সংগীত আয়োজন কোক স্টুডিও পাকিস্তানে পারফর্ম করা প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ, যেখানে তিনি কাজ করেন মেকাল হাসানের সঙ্গে।


সম্প্রতি পৌলমী গাঙ্গুলীর মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে শেলডন গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। তাঁর ভাষ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিটি গানের কথা অত্যন্ত গভীর এবং সুরগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রাণবন্ত। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নিজের সংগীতশৈলীতে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন।


গানটি প্রসঙ্গে পৌলমী গাঙ্গুলী বলেন, এটি তাঁর কাছে কেবল একটি সংগীত প্রকল্প নয়; বরং ভালোবাসা, বেদনা ও না বলা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে শেলডন মনে করেন, সংগীত একটি সর্বজনীন ভাষা, যা মানুষকে একত্রিত করে। তাই নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনার মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিশ্বব্যাপী আরও বিস্তৃত শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, ক্লাসিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের আধুনিক উপস্থাপনা সবসময়ই চ্যালেঞ্জের। তবে যথাযথ সংবেদনশীলতা বজায় রেখে তা উপস্থাপন করা গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। ‘দুঃখ যদি না পাবে তো’ সেই প্রচেষ্টারই একটি সফল উদাহরণ হিসেবে ইতোমধ্যে দুই বাংলার সংগীতপ্রেমীদের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।

মো. সেলিম হোসেন
০১৭২১-১৪০৪৫২